স্বাবলম্বীকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন দরিদ্রদেরকে প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ ও উপকরণ-সহায়তা প্রদান করে। বেকার ও অদক্ষ নারী-পুরুষকে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য (আলাদাভাবে) কারিগরি প্রশিক্ষণ পূর্বক আর্থিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রদান করে আত্মনির্ভরশীল করা এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
হালাল রিযক উপার্জন করার গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘সালাত সমাপ্ত হওয়ার পর তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো; আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সূরা জুমু‘আহ: আয়াত-১০)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না।’ (সহীহ বুখারী-২০৭২)
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হালাল রিযক অনুসন্ধানে সহায়তা করার মানসে তাদেরকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি একই সময়ে তাঁরা যাতে দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করতে পারেন এবং নীতিবান ও বিশ্বস্ত নাগরিক হন— এজন্য তাদেরকে প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলারদের মাধ্যমে ইসলামের মৌলিক আকীদা ও বিধান শিক্ষাদান করা হয়। যেন তারা আর্থিকভাবেও স্বাবলম্বীও হতে পারেন, পাশাপাশি আল্লাহর খাঁটি বান্দা নীতি-নৈতিকতায় বলীয়ান হিসেবে জীবন যাপন করতে পারেন।
আমরা মনে করি— শুধু প্রশিক্ষণ, অর্থ ও উপকরণ-সহায়তা প্রদান অনেকের ক্ষেত্রে স্বাবলম্বিতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। এজন্য আমরা ফাউন্ডেশনের অধীনে প্রশিক্ষিত, আর্থিক ও উপকরণ-সহায়তাপ্রাপ্তদের নিয়মিত তত্ত্বাবধান করি, খোঁজ-খবর রাখি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকি। এভাবে আমরা নৈতিকতা সম্পন্ন সুদক্ষ কর্মজীবী জনগোষ্ঠী তৈরিতে ভূমিকা রাখি।
সবার জন্য কুরবানী আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের মানবসেবামূলক নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই থেকেই ফাউন্ডেশন দীনদার ধনীদের পক্ষ থেকে গরিব জনগোষ্ঠীর মধ্যে কুরবানী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
সাধারণত বেশি সংখ্যক কুরবানী হয়ে থাকে শহর-কেন্দ্রিক। অথচ অধিক সংখ্যক গরিব বাস করে গ্রামে। শহরের একটি বহুতল ভবনে যত সংখ্যক গরু কুরবানী হয়ে থাকে, এই পরিমাণ গরু কুরবানী কয়েকটি গ্রামেও হয় কি না— যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সবার জন্য কুরবানী প্রকল্পের মাধ্যমে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন শহুরে ধনীদের কুরবানীর একটা অংশ প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধা-বঞ্চিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নিকট পৌঁছে দেয়।
মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবয়নে ফাউন্ডেশনকে ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীগণ সহয়তা করেন।
উল্লেখ্য, একটি ছাগল পূর্ণাঙ্গভাবে একজনের পক্ষ থেকে এবং একটি গরুর এক সপ্তমাংশ পূর্ণাঙ্গভাবে একজনের পক্ষ থেকে কুরবানী করে গোশত গরিবদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
এই প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১ হাজার ১৬৭ টি গরু-ছাগল কুরবানী করে দুস্থদের মধ্যে গোশত বিতরণ করা হয়েছে।
এছাড়াও ঢাকা থেকে গোশত সংগ্রহ করে ফ্রোজেন গাড়ির মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিবদের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়।
প্রতি বছর বর্ষাকালে বাংলাদেশের প্রায় ২৬,০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়। এসময় বিশেষভাবে দেশের উত্তরাঞ্চলের বানভাসি মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হন। আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশন দেশের বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে প্রতি বছরই ত্রাণ কার্যক্রম ও দুর্দশাগ্রস্ত-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে থাকে।
দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গুরুত্ব ও ফযীলত অনেক বেশি। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো অভাবীর কষ্ট দূর করবেন, আল্লাহ তা‘আলা ইহকালে ও পরকালে তার কষ্ট দূর করে দেবেন। ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা বান্দার সহায়তা করতে থাকেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার কোনো ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।’ (সুনান তিরমিযী, হাদীস-২৯৪৫)
এই কার্যক্রমের আওতায় অভাবী ও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হয় এবং উপরিউক্ত হাদীসের ওপর আমল হয়।
ত্রাণ সামগ্রীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— চাল, ডাল, তেল, আলু, চিড়া, মোমবাতি, গ্যাস লাইটার, খাবার স্যালাইন এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ।
বন্যায় ত্রাণ বিতরণ প্রকল্পের আওতায় শুধু ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ৩২ মেট্রিক টন খাদ্যসামগ্রীর পাশাপাশি শিশুখাদ্য ও গবাদি পশুর জন্য খৈল-ভূসি বিতরণ করা হয়েছে। একই বছর ঈদুল আযহায় ১০৫ টি গরু জবাই করে বন্যার্তদের মধ্যে গোশত বিতরণ করা হয়। বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে ৯৫৯ পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয় এবং ৯৯৬ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে নগদ ৫ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়।
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন সচ্ছলদের পক্ষ থেকে এতিম শিশুদের দায়িত্বভার গ্রহণ করে থাকে। তাদের ভরণ-পোষণ এবং উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার যাবতীয় দায়িত্ব দাতার পক্ষ থেকে ফাউন্ডেশন পালন করে থাকে। এতিমের লালন-পালন মানে তাকে যেনতেনভাবে লালন পালন করা নয়; বরং সামর্থ অনুযায়ী (অনেকটা নিজের সন্তানের মতো) তাকে লালন পালন করা উচিত। সেজন্য ফাউন্ডেশন এতিমদেরর জন্য স্পন্সরের পক্ষ থেকে উন্নমানের পানাহার, চিকিৎসা এবং পড়াশোনার বন্দোবস্ত করে থাকে।
মহান আল্লাহর সন্তষ্টি ও সওয়াবের আশায় এতিমের অভিভাকত্ব গ্রহণ বা দায়িত্বভার নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত ও শ্রেষ্ঠতম দানের খাত। সাহল বিন সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আমি ও এতিমের প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব (তিনি তর্জনি ও মধ্যমা আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করেন)।’ (সুনান আবু দাউদ: হাদীস-৫১৫০)
সাদকাহ জারিয়াহ মানে— যে দানের উপকারিতা শুধু এককালীন নয়; বরং দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকে। যে দানের উপকারিতা একবারই অর্জিত হয়, সেগুলোর সওয়াবও একবারই হয়। পক্ষান্তরে যে দানের উপকারিতা দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকে, সেগুলোর সাওয়াব তথা বিনিময়ও মহান আল্লাহ দীর্ঘদিন পর্যন্ত অব্যাহত রাখেন।
আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায় তিন প্রকার আমল ছাড়া। ১. সাদাকাহ জারিয়াহ; ২. এমন ইলম বা জ্ঞান যার দ্বারা অন্যের উপকার হয়; ৩. পুণ্যবান সন্তান যে তার জন্যে দু'আ করতে থাকে’। (সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৬৩১)
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের সাদাকায়ে জারিয়া প্রকল্পসমূহের মধ্যে রয়েছে মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ, নলকূপ খনন, দীনি বই-পুস্তক বিতরণ ও গৃহহীনদের জন্য গৃহ নির্মাণ ইত্যাদি।
এসব প্রকল্পের নির্দিষ্ট কোনো একটির দায়িত্ব এককভাবে নেওয়া যায়। আবার কেউ চাইলে সাদাকাহ জারিয়াহ খাতে যে কোনো পরিমাণ দান করতে পারেন। সে অর্থ কতৃপক্ষ সাদাকা জারিয়াহর যে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজন অনুভব করবেন সে খাতে ব্যয় করবেন।
এই প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ঠাকুরাঁওয়ে ১০টি নওমুসলিম পরিবারকে ১.৫ শতাংশ জমি ক্রয় পূর্বক বাসগৃহ নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে।